শিউলি শবনম
লামেধুরা গ্রামে পৌঁছে ভারি ব্যাকপ্যাক নিয়ে রিমঝিম প্রায় হাঁফিয়ে ওঠে। মাজেদও। অবশেষে ৪০০ রুপির বিনিময়ে দু’জনের ব্যাকপ্যাক উঠে দুই ঘোড়ার মালিকের পিঠে। কারণ, ঘোড়ার পিঠে জায়গা আর অবশিষ্ট নেই। লামেধুরা পেরিয়ে মেঘমা গ্রামে ঢুকতেই আশ্চর্য মেঘদল এসে স্বাগত জানায় আমাদের! ভারি কুয়াশা সমস্ত প্রকৃতি ঢেকে ফেলে। কানটুপি মাফলার জড়িয়েও নাকে মুখে হু হু করে ঢুকে যাওয়া বরফ শীতল বাতাস ও কুয়াশা আটকানো দূরুহ হয়ে পড়ে। কঠিন হয়ে ওঠে কয়েক গজ আগে পিছে হাঁটা বন্ধুদের দেখতে পাওয়া। ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশায় প্রায় প্রত্যেকেরই নাক বেয়ে অনবরত স্বচ্ছ জলের ধারা নামতে থাকে। একের পর এক ভিজতে থাকে টিস্যু। পাহাড়ের এই রোদ, এই মেঘ, বৃষিট আবহাওয়া যেন বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র শার্লক হোমসকেও হার মানাবে! ভরদুপুরের প্রকৃতি কেমন করে যেন হয়ে ওঠে বিষণœ একটি সন্ধ্যা। অথচ ক্ষণিক আগেই ছিল সোনাঝরা রোদ! এরই মাঝে একটা পাথরের সাথে আচমকা ধাক্কা লেগে রিমঝিমের নাক থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। পাথরের ভাঁজে হারিয়ে যায় তার সোনার নাকচাবি। ফরেস্টার কামরুল বিশেষ কায়দায় আবার সে চাবি উদ্ধার করে সবাইকে চমকে দেয়! আমরা কুয়াশায় পথ ভাঙতে ভাঙতে তুমলিংয়ের পথে হাঁটি…। একটু পর পর একেক জন গাইডকে প্রশ্ন করি ,‘প্রবেশ, কিতনা দূর, কিতনা দূর…’ ? প্রবেশের সংক্ষিপ্ত উত্তর , ‘দো কিলো, এক কিলো।’ হাঁটতে হাঁটতে এরইমধ্যে আমার বাম পায়ের দু’আঙ্গুল অসাড় হয়ে পড়ে। আমারই মতো ফুট ক্র্যাম্প হয় রিমঝিম, জোনায়েদ ভাইসহ আরো কারো কারো। আমরা একে অন্যের পা, আঙ্গুল ম্যাসেজ করে নিজেরা দ্রুত ফিট হয়ে উঠি।
হাঁটতে হাঁটতে বিরানভূমির মতো ন্যাড়া পাহাড় ডিঙিয়ে নেপাল সীমান্তবর্তী গ্রাম তুমলিংয়ে যখন পৌঁছি, তখন ক্ষুধা, তৃষ্ণায় আমাদের কাতর হওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্য, আমরা ঠিক অতোটা কাতর হই না। প্রকৃতির খেয়ালের সাথে, রূপ ও সুধার সাথে আমরা তখন মিলেমিশে একাত্ম। ততক্ষণে আমার উঠে গেছি প্রায় ৩০০০ মিটার উচ্চতায়। তুমলিংয়ের দোতলা এক নেপালি রেস্টুরেন্টে উঠে আমরা দুপুরের খাবার হিসেবে ঝটপট খেয়ে নিই গরম গরম স্যুপি নুডুলস ও এক কাপ চা। এটিই ট্রেকারদের জন্য একমাত্র সহজলভ্য খাবার।
বেশিরভাগ ট্রেকিং গ্রুপ তুমলিংয়ে প্রথমদিনের ট্রেক শেষ করলেও আমরা শেষ করি আরো কয়েক কিলোমিটার পরে গৈরিবাস গ্রামে। সেখানে গিয়ে প্রথম দেখা হয় ঢাকা থেকে যাওয়া ভ্রমনকারী একটি দলের সাথে। তখন সন্ধ্যার আঁধার ছুঁই ছুঁই। গৈরিবাসে এসে থামতেই প্রবল ঠান্ডা, ভারি বাতাস এসে আমাদের উপর ভীষণ উৎপাত শুরু করে। শীতে ঠকঠক কাঁপন লাগে আমাদের অস্থি-মজ্জায়। ঢাকার ভ্রমনদল ঠাট্টা করে বলে, ‘আরে দেশে ফিরে যান, কী দরকার এতো কষ্ট করে ট্রেকিং করার। কুয়াশার জন্য কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। আজ সান্দাকফুতে উঠেও ভালো ভিউ পাইনি আমরা’। দেশের স্বজন পেয়ে আমরা খানিক কথাবিনিময় করি। তারা জীপে করে অন্য জায়গার উদ্দেশে চলে যায়। আর আমরা শ্রীরাধা নামে এক নেপালি নারীর দোতলা ডরমেটরিতে উঠি। সন্ধ্যা নামতেই রুম ছেড়ে আমরা গৈরিবাসের শান্ত-নিস্তব্ধ লোকালয়ের দিকে হাঁটি। পাহাড়ের গায়ের কাছে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়াই। কোথাও কেউ নেই। আমরা কেউ কারো মুখও দেখি না। কেবল অনুভব করি গৈরিবাসের রাতের নীরবতা। কিছুক্ষণ সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, তিস্তা, মমতা সব কিছুর মুন্ডুপাত করে, আমাদের সারাদিনের ট্রেকিং ক্লান্তি পাহাড়ের বুকে জমা রেখে- রুমে ফিরি আরো কিছু সময় পর।
শীতপ্রবণ এইসব লোকালয়ে দেখি দোকানপাট, বাড়ি-ঘর সব সন্ধ্যা হতেই ঝাঁপি লেগে যায়। তাই বাধ্য হয়ে রাতের খাবার আমাদের সেরে নিতে হয় সন্ধ্যে পেরুতেই। পাপড় ভাজা-চাটনি, সাদা ভাতের সাথে টমেটো, শসা, ক্যাপসিকাম, বেগুনি বাধাকপি মেশানো সালাদ, ডাল, ডিমসহ রাতের খাবার শেষ হতেই ক্লান্তি এসে ভর করে আমাদের। শ্রীরাধার রান্না ঘরে কয়লার চুল্লিতে আগুনের তাপ নিতে নিতে আধা হিন্দি-আধা ইংরেজিতে তার সাথে আলাপ জমাই। বেশ সাহসী ও শক্ত মহিলা। স্বামী মারা গেছে অনেক বছর। ছেলে পড়ে দার্জিলিংয়ের কোনো এক বোর্ডিং স্কুলে। মেয়েটি স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি মায়ের ব্যবসায় সাহায্য করে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখি, কনুই পর্যন্ত বাদামী গ্লাভস পরে নিবিড়মনে এঁটো হওয়া থালাবাসন, হাঁড়ি-পাতিল বরফশীতল টেপের পানিতে ধুয়ে চলেছে সে। বর্ষার কয়েকমাস ছাড়া এখানে সারা বছরই পর্যটক লেগে থাকে। পর্যটক বেশি এলে শ্রীরাধার আনন্দও বেশি!
খাওয়া শেষে রাতে যখন দোতলার ডরমেটরিতে আমরা ঘুমাতে যাই, কারো পক্ষেইে সিঁড়ি ভাঙ্গা তখন সহজ ছিল না। পায়ের শিরা-উপশিরা তীব্র ব্যথায় টেনে ধরে আছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যথাযুক্ত পা নিয়ে কোনোমতে উঠে পেইন কিলার খেয়ে শুয়ে পড়ি আমরা। একে অন্যের ঘাঁড়, পা মুভ দিয়ে ম্যাসেজও করে নিই কেউ কেউ। দ্রুত সেরে উঠতে হবে আমাদের। কারণ, পরের ভোর এই ট্রেকিংয়ের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়।
দ্বিতীয় দিনের ট্রেকিং: গৈরিবাস থেকে সান্দাকফু
১২ নভেম্বর ভোরে গরম, পোড়া পোড়া ডিম-পাউরুটি ভাজা এবং ওই অঞ্চলের জনপ্রিয় মোমো দিয়ে নাস্তা সারি আমরা। পরে এককাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে আমরা যখন শ্রীরাধার ম্যাগনোলিয়া লজের বাইরে নরম রোদে গিয়ে দাঁড়াই আর দেখতে থাকি দিগন্তজোড়া ঘন পাইনের বন-কেমন করে আকাশ ছাপিয়ে দৃঢ় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, কুয়াশায় মোড়ানো এ জনপদের ছোট ছোট টিনশেড ঘর-বাড়ি কেমন উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে! কোথাও যেন কোনো তাড়া নেই, অস্থিরতা নেই, সারা লোকালয়জুড়ে গভীর এক ধ্যানমগ্নতা। তখন আমাদের বুকের ভেতরটাও কেমন যেন আশ্চর্য প্রশান্তিতে ভরে উঠে। গৈরিবাসের চেকপোস্টে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিয়ে জোনায়েদ ভাই তাড়া দেন, ট্রেকিংয়ের সময় শুরু।
যে লজে রাত কাটাই, ঠিক তার গা ঘেঁেষ উপরের দিকে উঠে গেছে পায়ে হাঁটার পাহাড়ি পথ। কংক্রিট, ছোট-বড় পাথরে এবড়ো-থেবড়ো। ট্রেকিং পুলে ভর দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে উপরে উঠা শুরু করি। ট্রেকিংয়ের সবচেয়ে কষ্টকর এই হাঁটাপথ ঠিক কতোটা যন্ত্রণাময়, শ্বাসরুদ্ধকর হতে পারে তখনো বুঝিনি। স্উুচ্চ, ধ্যানী পাহাড়ের সুশৃঙ্খল সারি, সিঙ্গালিলার রহস্যময় উদ্যান, সাপের মতো আঁকাবাঁকা সড়ক, টিলার উপর ছোট ছোট বাড়ি-ঘর দেখে দেখে আমার রাস্তা বদলাই। কখনো মেঘ, কখনো রোদের সাথে আকাশের রঙ বদল দেখি। দেখি পাতাঝরা বনপথ, চিরহরিৎ বৃক্ষ, রঙ বেরঙের গুল্ম, পথের ধারে ফুটে থাকা শত-সহ¯্র নাম না জানা ফুল, উন্মুখ তাকিয়ে থাকা রঙিন পত্রপল্লবের বিস্ময়কর ডালি আমাদের যেন পাগল করে তোলে। মাঝে মাঝে ভেসে আসে পাখির কলতান। বন্যপ্রাণী ও গাছ ভালবাসার আহ্বান জানিয়ে গাছের গায়ে সেঁটে দেয়া সিঙ্গালিলা পার্ক কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখি। দেখতে দেখতে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় ডিঙ্গাই। একেকটা সুবিশাল পাহাড় কেমন করে আমাদের বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায়! গভীর প্রশান্তি এসে ছড়িয়ে যায়। আমরা শুধু অনুভব করি।
এই ট্রেকের প্রতিটি বাঁকে, প্রতি পদে পদে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর সব সৌন্দর্য। কায়কাটার বন-জঙ্গল পেরিয়ে যখন কালাপোখারি পৌঁছি তখন বুদ্ধ ভক্তরা ছোট্ট লেকের কালো পানিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন। তুষারপাতের দিনে যখন চারপাশ বরফে ঢাকা পড়ে তখনো জমে না এই পানি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই পানি অতি পবিত্র। লেকের চারপাশ ভয়ংকর সুন্দর সব পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেসব পাহাড়ের চূড়ায় জেগে আছে কুয়াশা জড়ানো রোদ আর রাশি রাশি ইতস্তত মেঘ। আমরা কিছু সুন্দর ক্যামেরায় ধারণ করি। আর পুরোটাই হৃদয়ে। ক্যামেরায় সে সুন্দর ধরা সম্ভব না! ফিল্মমেকার সুজন ভাইকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে তিনি সে আচ্ছন্ন করা সৌন্দর্যের পেছন পেছন ছুটছেন ধারে-পিঠে কোথাও। ততক্ষণে আমরা প্রত্যেকেই ক্লান্তিতে জর্জর। চটপটে, স্মার্ট, ফ্রান্স ভাষা জানা রিয়াদ তখন দুই ফরাসী ট্রেকারের সাথে গভীর আলাপনে মগ্ন, কালাপোখারির এক ঝুপড়ি হোটেলে। হোটেলে ঢুকে কামরুল, জোনায়েদ ভাই চোখ বুজে সটান শুয়ে পড়ে ছিপছিপে বেঞ্চিতে। অর্ডার দেয়া হয় আমাদের প্রত্যেকেরই প্রায় বিতৃষ্ণা জাগানো স্যুপি নুডুলস। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আমাদের অপেক্ষা যেন আর ফুরায় না। এই ফাঁকে দুই ফরাসি ট্রেকারের সাথে আমরাও অল্প-স্বল্প আড্ডা জমাই, পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। ভীষণ বন্ধুবৎসল, প্রাণবন্ত দু’জনের কেউ-ই ফেসবুক ব্যবহার করেন না! আমাদের মতো ফেসবুক ম্যানিয়ায় ভোগা জাতির কাছে সেটা বিস্ময়কর খবরই বটে! ততক্ষণে খাবার টেবিলে চলে আসে সসপ্যান ভর্তি ধোঁয়া ওঠা স্যুপি নুডুলস। # চলবে




